আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীন প্রতিরক্ষা ক্রয় কাউন্সিল (ডিএসি) ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকার একাধিক উচ্চ-মূল্যের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বে ডিএসি এই অনুমোদন দিয়েছে । অনুমোদিত সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে, আর্মার্ড রিকভারি ভেহিকল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, ত্রিসেনার (স্থল, বায়ু ও নৌ সেনা) জন্য একটি সম্মিলিত ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা এবং সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ডিএসি মোট ১০টি ক্যাপিটাল অ্যাকুইজিশন প্রস্তাবে "প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি" দিয়েছে, যা প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই স্বীকৃতি প্রদান মানেই চূড়ান্ত চুক্তি নয়, এটি কেবলমাত্র ক্রয়ের প্রাথমিক অনুমোদন।
এই বিপুল আকারের ক্রয় পরিকল্পনাগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ গত মে মাসে সংঘটিত ভারতের "অপারেশন সিন্ধুর" প্রেক্ষাপটে, যা ২২ এপ্রিলের পহেলগাওঁ সন্ত্রাসী হামলার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সংঘটিত হয়েছিল। সেনা অভিযান চলাকালীন ভারতীয় প্রযুক্তি এবং সামরিক সক্ষমতার বিস্তৃত ব্যবহারে যে সফলতা অর্জিত হয়েছে, এই ক্রয় সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন।
ডিএসি কর্তৃক আরও সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ক্রয়ের অনুমোদন ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত আকাশ মিডিয়াম রেঞ্জ মিসাইল এবং রাশিয়ান S-400 ট্রাইয়াম্ফ সিস্টেম—উভয়ই অপারেশন সিন্ধুর সময় কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এরই ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সেনাবাহিনীর আধিকারিকরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ভারতীয় মেকানাইজড ফোর্স বহুদিন ধরে একটি বড় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে—সেটি হলো প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক ও আর্মার্ড রিকভারি ভেহিকলের মধ্যে সমন্বিত গতির অভাব। নতুন আর্মার্ড ভেহিকেল প্রাপ্তির ফলে মেকানাইজড হামলার সময় ট্যাংক ইউনিটগুলির কৌশলগত গতিশীলতা বহুগুণে বাড়বে।
অপারেশন সিন্ধুর সময় ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং তার পাল্টা ব্যবস্থাগুলো শত্রুপক্ষের রাডার ও কমিউনিকেশন নিস্তেজ করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। ইউএভি ও যুদ্ধবিমানের জন্য প্রযুক্তিগত আধিপত্য বজায় রাখতে এই ব্যবস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই ক্ষেত্রেও শক্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে।
মন্ত্রকের ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রিসেনার জন্য যৌথ ইনভেন্টরী ব্যবস্থাপনা সিস্টেম চালু হলে, তিন বাহিনীর মধ্যে ব্যবহৃত অভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জামের যোগান ও উপস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা আসবে। যুদ্ধক্ষেত্র -ভিত্তিক সরঞ্জাম বন্টনের মাধ্যমে সম্পদের সুষম ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে, যা অপারেশনাল প্রস্তুতি আরও মজবুত করবে।
ডিএসি সমুদ্র সংক্রান্ত বিপদ মোকাবিলায়ও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মোর্ড মাইন, মাইন কাউন্টারমেজার ভেসেল, সুপার র্যাপিড গান মাউন্ট ও সাবমার্সিবল অটোনোমাস ভেসেল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, এইসব ব্যবস্থা নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপত্তা বাড়াবে এবং সম্ভাব্য বিপদকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে।
এই সকল অনুমোদন 'ক্রয় (ভারতীয়-দেশীয় ডিজাইনে উন্নীত করা এবং তৈরি)' ক্যাটাগরির আওতায় এসেছে। অর্থাৎ, এগুলো সম্পূর্ণভাবে দেশীয়ভাবে ডিজাইন ও নির্মিত হবে। এতে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্পে নতুন গতি আসবে এবং আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে আরও এক ধাপ অগ্রসর হবে।
এই বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও সুসংহত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পথে এক বড় পদক্ষেপ নিল—যা ভবিষ্যতের যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা কৌশলের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ