বিশেষ প্রতিনিধি, Sanchoy Biswas।।
আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি
পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত কর্তৃক ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তি (আইডব্লিউটি) "অবিলম্বে" স্থগিত করার কয়েক দিন পর, ইসলামাবাদ প্রথমবারের মতো চুক্তি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগের বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতের জলসম্পর্কিত আপত্তিগুলিকে সামনে রেখে পাকিস্তানের জলসম্পদ সচিব সৈয়দ আলী মুর্তজা সম্প্রতি ভারতীয় সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রেক্ষিতে একটি প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি তার দেশের পক্ষ থেকে আইডব্লিউটির বিতর্কিত দিকগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সূত্র মতে, মুর্তজা ভারত কর্তৃক চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তি তে স্পষ্ট কোনও প্রত্যাহারের ধারা নেই। এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের দিক থেকে এক নতুন কূটনৈতিক মনোভাবের ইঙ্গিত, বিশেষত সেই প্রেক্ষাপটে যেখানে ভারত ইতিপূর্বে দু’বার — জানুয়ারি ২০২৩ এবং সেপ্টেম্বর ২০২৪ চুক্তির পর্যালোচনা এবং সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেসময় ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করেনি। কিন্তু ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর নয়াদিল্লি সিন্ধু চুক্তি কার্যকরভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তান আলোচনায় আগ্রহ দেখায়, যা কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
এই পটভূমিতে ২৪ এপ্রিল ভারতীয় জলসম্পদ সচিব দেবাশ্রী মুখার্জী তার পাকিস্তানি সমকক্ষকে একটি চিঠি পাঠান, যাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, “সদিচ্ছার সাথে একটি চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা চুক্তির মূল ভিত্তি। তবে, পাকিস্তান নিয়মিত ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরকে লক্ষ্য করে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাচ্ছে, যা এই চুক্তির নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করছে।”
মুখার্জী আরও লিখেছেন, “এই নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা ভারতের পক্ষে তার প্রাপ্য জলসম্পদ ব্যবহারে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া পাকিস্তান আইডব্লিউটির আওতায় নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিতে বারবার অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা স্পষ্ট চুক্তিভঙ্গ। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চুক্তিটি অবিলম্বে স্থগিত করা হবে।”
এই চিঠির প্রতিক্রিয়ায় মুর্তজা দিল্লিকে একটি আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়ে জানান, পাকিস্তান ভারতের আপত্তিগুলি আলোচনায় আনতে রাজি আছে এবং কিছু নির্দিষ্ট প্রকল্প নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব বলেই ইসলামাবাদ মনে করে। তবে একই সাথে তিনি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে “চুক্তিভিত্তিক অনুপযুক্ত” বলে অভিহিত করেন।
তবে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আইডব্লিউটি স্থগিত করার মতো পদক্ষেপগুলো কূটনৈতিক স্তরে বজায় থাকবে এবং এতে কোনো পরিবর্তন আসবে না, যতক্ষণ না পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসে তার ভূমিকা পরিবর্তন করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “সিন্ধু জলচুক্তি সদিচ্ছা ও বন্ধুত্বের চেতনায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। যতক্ষণ না ইসলামাবাদ আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস থেকে বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সরে আসে, ততক্ষণ এই চুক্তি স্থগিত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যাগত চাপ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে চুক্তির অনেক ধারা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ফলে এই চুক্তির পূনর্মূল্যায়ন অনিবার্য।”
কূটনৈতিক সূত্রের মতে, পাকিস্তানের আলোচনার প্রস্তাব কৌশলগতভাবেই ভারতের জলসম্পদ প্রকল্পগুলিকে থামানোর একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। কারণ ভারত সিন্ধু নদ ও তার উপনদী গুলির জল সঞ্চয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। এক্ষেত্রে চুক্তির আলোচনার নামে দেরি করানো ইসলামাবাদের একটা চেনা কৌশল বলেও ধারণা করা হচ্ছে। চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত, তবে এটি স্পষ্ট যে, নয়াদিল্লি এ মুহূর্তে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিরাপত্তা ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আর পাকিস্তান, কিছুটা চাপে পড়েই হোক বা নিজের কৌশলগত স্বার্থে, দীর্ঘদিন পর আইডব্লিউটি-র আলোচনায় আগ্রহ দেখাতে বাধ্য হয়েছে।